মূল বিষয়ে যান

গাইড

কীভাবে উমরাহ পালন করবেন: ধাপে ধাপে নির্দেশিকা

মিকাতে নিয়ত থেকে তাওয়াফ, সাঈ ও তাকসির পর্যন্ত: উমরাহর প্রতিটি আমল ধারাবাহিকভাবে, যে দোয়াগুলো শিখবেন, যে ভুলগুলো এড়াবেন এবং সফরের আগে যা গুছিয়ে নেবেন।

আন্তরিক হজ্জ কাফেলা ৫ মিনিটে পড়ুন

উমরাহ পালনে রয়েছে বিরাট আত্মিক প্রতিদান। নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শিখিয়েছেন, এক উমরাহ থেকে আরেক উমরাহ মধ্যবর্তী গুনাহের কাফফারা; তিনি হজ ও উমরাহকে আল্লাহর পথে প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর আমল অল্প এবং কয়েক ঘণ্টায় সম্পন্ন করা যায়, কিন্তু প্রতিটির রয়েছে গভীর তাৎপর্য। ভালোভাবে জানা থাকলে শান্ত মনে, পুরো হৃদয় দিয়ে তা পালন করা যায়।

সফরের আগে

বাড়ি ছাড়ার আগেই আমল ও দোয়াগুলো শিখে নিন, সম্ভব হলে কর্মশালায় অংশ নিন। পুরুষেরা দুই সেট ইহরাম, সুগন্ধিমুক্ত সাবান, স্যান্ডেল রাখার ছোট ব্যাগ ও জায়নামাজ নিন। ইহরাম পরার আগেই নখ কাটুন এবং শরীরের অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করুন, কারণ ইহরাম অবস্থায় তা নিষিদ্ধ। পাসপোর্ট ও ভিসার কাগজ গলায় ঝোলানো থলেতে রাখুন।

উমরাহর ধাপসমূহ

  1. ১ মিকাতে নিয়ত ও ইহরাম: গোসল করুন, পুরুষেরা দুটি সাদা সেলাইবিহীন কাপড় এবং নারীরা শরীর ঢাকা শালীন পোশাক পরবেন, এরপর মাকরুহ সময় না হলে দুই রাকাত নামাজ পড়ুন। মিকাত অতিক্রমের আগে নিয়ত করুন: "লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা উমরাহ" (হে আল্লাহ, আমি উমরাহর জন্য হাজির)। বাংলাদেশ থেকে অধিকাংশ ফ্লাইটে মিকাত হলো ইয়ালামলাম; বিমানে তা ঘোষণা করা হয়, আর অনেক হাজি ঢাকায় বিমানে ওঠার আগেই ইহরাম পরে নেন।
  2. ২ তালবিয়া: মিকাত থেকে তাওয়াফ শুরু পর্যন্ত বারবার পাঠ করুন, পুরুষেরা উচ্চস্বরে ও নারীরা নিচুস্বরে: "লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।"
  3. ৩ মসজিদুল হারামে প্রবেশ: ডান পা দিয়ে মসজিদে প্রবেশের দোয়া পড়ে, বিনয়ী দৃষ্টিতে প্রবেশ করুন। প্রথমবার কাবা দেখে থামুন ও দোয়া করুন; অনেক হাজি এই মুহূর্ত সারা জীবন মনে রাখেন।
  4. ৪ তাওয়াফ: পুরুষেরা ডান কাঁধ খোলা রাখবেন (ইজতিবা)। হাজরে আসওয়াদের রেখা থেকে শুরু করুন, সেদিকে মুখ করে ডান হাত তুলে "বিসমিল্লাহ, আল্লাহু আকবার" বলুন, এরপর কাবাকে বাম পাশে রেখে সাতবার প্রদক্ষিণ করুন। সামর্থ্য থাকলে পুরুষেরা প্রথম তিন চক্করে দ্রুত হাঁটবেন (রমল)। রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝে পড়ুন: "রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাহ, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়া কিনা আযাবান নার।"
  5. ৫ দুই রাকাত নামাজ ও জমজম: কাঁধ আবার ঢেকে সম্ভব হলে মাকামে ইবরাহিমের পেছনে, ভিড় থাকলে মসজিদের যেকোনো স্থানে দুই রাকাত নামাজ পড়ুন। এরপর জমজমের পানি পান করুন এবং মনের ইচ্ছামতো দোয়া করুন।
  6. ৬ সাঈ: সাফায় গিয়ে পড়ুন "ইন্নাস সাফা ওয়াল মারওয়াতা মিন শাআইরিল্লাহ", কাবার দিকে মুখ করে দোয়া করুন, এরপর মারওয়ার দিকে চলুন। সাফা থেকে মারওয়া এক চক্কর এবং মারওয়া থেকে সাফা দ্বিতীয়; সপ্তম চক্কর মারওয়ায় শেষ হবে। পুরুষেরা সবুজ বাতির মাঝে দ্রুত চলবেন। সাঈর জন্য অজু শর্ত নয়, তবে অজু থাকা উত্তম।
  7. ৭ হলক বা তাকসির: পুরুষেরা পুরো মাথা মুণ্ডন করবেন (উত্তম) অথবা সমানভাবে সব দিক থেকে চুল ছাঁটবেন; নারীরা চুল একত্র করে আগা থেকে প্রায় এক ইঞ্চি কাটবেন। এর মাধ্যমে আপনার উমরাহ সম্পন্ন হলো এবং ইহরামের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল।

ইহরাম অবস্থায় যা নিষিদ্ধ

নিয়ত করার মুহূর্ত থেকে চুল মুণ্ডন বা ছাঁটা পর্যন্ত বিরত থাকুন: চুল বা নখ কাটা; সুগন্ধি বা সুগন্ধিযুক্ত সাবান ব্যবহার; দাম্পত্য সম্পর্ক ও তার দিকে নিয়ে যায় এমন কিছু; শিকার; ঝগড়া ও কটু কথা। পুরুষেরা শরীরের মাপে সেলাই করা পোশাক পরবেন না এবং মাথা ঢাকবেন না; নারীরা নিকাব দিয়ে মুখ ঢাকবেন না বা হাতমোজা পরবেন না, তবে অপরিচিতদের সামনে মুখের সামনে কাপড় ঝুলিয়ে দিতে পারেন। ভুলবশত বা ভুলে গিয়ে কিছু হয়ে গেলে দলের আলেমকে জিজ্ঞেস করুন; অনেক ভুলে কোনো দণ্ড নেই, আর কিছুর সহজ প্রতিকার আছে।

যে ভুলগুলো এড়াবেন

  • ইহরাম ছাড়া মিকাত অতিক্রম করা। বিমান কোথায় মিকাত পার হবে নিশ্চিত না হলে ওঠার আগেই ইহরাম পরে নিন।
  • হাজরে আসওয়াদ ছুঁতে বা চুমু দিতে ধাক্কাধাক্কি করা। দূর থেকে ইশারা করলেই সুন্নাহ আদায় হয়, কাউকে কষ্ট না দিয়েই।
  • হাতিমের (হিজরে ইসমাইল) ভেতর দিয়ে তাওয়াফ করা। এর বাইরে দিয়ে প্রদক্ষিণ করুন, কারণ এটি কাবার অংশ।
  • অল্প কয়েকটি চুল কাটা। পুরুষেরা পুরো মাথা থেকে ছাঁটবেন; নারীরা আঙুলের ডগা পরিমাণ কাটবেন।
  • কেন এসেছেন তা ভুলে যাওয়া। কেনাকাটা ও ছবির চেয়ে দোয়া, কোরআন ও নামাজে সময় দিন।

নারী, পরিবার ও বয়স্ক হাজিদের জন্য

ঋতুস্রাব চলাকালীন একজন নারী মিকাতে ইহরাম বাঁধতে পারেন এবং তাওয়াফ ও মসজিদে নামাজ ছাড়া হাজির সব কাজ করতে পারেন; পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে গোসল করবেন, তারপর তাওয়াফ ও উমরাহর বাকি কাজ সম্পন্ন করবেন। নারীরা তাওয়াফে দ্রুত হাঁটবেন না, সবুজ বাতির মাঝে দৌড়াবেন না এবং তালবিয়া নিচুস্বরে পড়বেন।

শিশুরা বাবা-মায়ের সাথে উমরাহ করতে পারে; যারা খুব ছোট, তাদের পক্ষে বাবা-মা নিয়ত করবেন এবং তাওয়াফ ও সাঈতে কোলে বা হাতে নিয়ে চলবেন। বয়স্ক বা অসুস্থ হাজিদের জন্য মসজিদুল হারামে হুইলচেয়ার ও বৈদ্যুতিক গাড়ি পাওয়া যায়, আর ওপরের তলায় সাধারণত তাওয়াফ ও সাঈ তুলনামূলক নিরিবিলি হয়। আগে থেকে জানালে আমাদের টিম সহায়তার ব্যবস্থা করবে, হারামের কাছের হোটেল বেছে দেবে এবং দিনের সবচেয়ে শান্ত সময়ে আমলগুলোর পরিকল্পনা করবে।

যে দোয়াগুলো মুখস্থ রাখা ভালো

প্রতিটি পর্যায়ে মন থেকে বাংলায় বা যেকোনো ভাষায় দোয়া করতে পারেন। তবে কয়েকটি মুখস্থ থাকলে সুবিধা হয়: তালবিয়া, রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝে "রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাহ", সাফা ও মারওয়ার আয়াত এবং মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়ার দোয়া। আমাদের কর্মশালায় প্রত্যেক হাজিকে আরবিসহ বাংলা অর্থে এগুলোর একটি ছোট পুস্তিকা দেওয়া হয়।

উমরাহর পরে: মদিনা

অনেক হাজি এরপর মদিনায় গিয়ে মসজিদে নববীতে নামাজ আদায় করেন এবং রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও তাঁর দুই সাহাবি আবু বকর ও উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর প্রতি সালাম পেশ করেন। রিয়াজুল জান্নাহ (রওজা) যিয়ারতের জন্য নুসুক অ্যাপে অনুমতি নিতে হয়; এতে আমাদের টিম প্রত্যেক হাজিকে সহায়তা করে। মদিনায় আমাদের দল মসজিদে কুবা, উহুদ পাহাড় ও শহীদদের কবরও যিয়ারত করে।

যাওয়ার আগে শিখে নিন

প্রতিটি দল রওনা হওয়ার আগে ঢাকায় আমরা উমরাহ কর্মশালা করি, যেখানে আলেমগণ প্রতিটি ধাপ, প্রতিটি পর্যায়ের দোয়া এবং ভ্রমণ ও স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ বুঝিয়ে দেন। এরপর মক্কা ও মদিনায় প্রতিটি আমলে আলেমগণ বাংলায় দলকে পথ দেখান, যাতে পরের কাজ নিয়ে কেউ দ্বিধায় না থাকেন।

ট্যাগ: #Umrah #Ihram #Tawaf
শেয়ার করুন

আরও পড়ুন

সব লেখা
গাইড

৫ মিনিটে পড়ুন

উমরাহ কী? ২০২৬–২৭ সালে আপনার উমরাহর পরিকল্পনা

উমরাহ অর্থ পবিত্র কাবার "যিয়ারত"; বছরের যেকোনো সময় তা পালন করা যায়। উমরাহ কী, হজ থেকে এর পার্থক্য, এর ফজিলত, যাওয়ার উপযুক্ত সময় এবং এ মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে কীভাবে উমরাহর পরিকল্পনা করবেন।

পুরোটা পড়ুন
সংবাদ ও বিজ্ঞপ্তি

৫ মিনিটে পড়ুন

হজ ২০২৮: নিবন্ধন চলছে

হজ ২০২৭-এর নিবন্ধন শেষ। এখনই আমাদের সাথে হজ ২০২৮-এর যাত্রা শুরু করুন: আপনার কাগজপত্র আমরা প্রস্তুত করব এবং সরকারি নিবন্ধন খুললেই আপনাকে নিবন্ধন করিয়ে দেব। কী কী অন্তর্ভুক্ত, কেন আগে শুরু করবেন এবং সাধারণ প্রশ্নের উত্তর।

পুরোটা পড়ুন
সংবাদ ও বিজ্ঞপ্তি

৫ মিনিটে পড়ুন

হজ ২০২৮: এখন যা প্রস্তুত রাখবেন এবং নিরাপদে যেভাবে টাকা দেবেন

হজ ২০২৭-এর নিবন্ধন শেষ হয়েছে। হজ ২০২৮-এর মৌসুম কীভাবে এগোবে, এখনই যে কাগজপত্র ও স্বাস্থ্য প্রস্তুতি শুরু করবেন, কীভাবে প্যাকেজ বাছাই করবেন, নিরাপদে টাকা পরিশোধের নিয়ম এবং আমাদের ফেরত নীতি।

পুরোটা পড়ুন